শান্তিনিকেতনের সঙ্গে আমাদের যে পারিবারিক যোগ সেটা শৈলজাদার মাধ্যমে। আমাদের বাবা সুরেশচন্দ্র মজুমদার হলেন শৈলজাদার আপন ও একমাত্র মামা । শৈলজাদা , আমাদের সবার বড়দা, তাঁর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বহুদিনের। আমাদের পৈত্রিক বাড়ি ছিল নেত্রকোণায়, যেখানে বড়দাদের ও বাড়ি। আমার বাবা খুব ছোটবেলাতেই তাঁর মা ও বাবাকে হারান , তার পরে আমাদের বড়ো পিসি সরলা সুন্দরী , শৈলজাদার মা , তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে এসে মানুষ করেন। বড়দা বাবার থেকে পাঁচ বছরের বড়ো ছিলেন অর্থাৎ ভাগ্নে ছিলেন মামার থেকে বড়ো। শৈলজাদারা ছিলেন সাত ভাই এক বোন – বাবা তাঁদের সমবয়েসী  হওয়ায় সহোদর ভাই এর মতোই বড়ো হতে লাগলেন।  পরে বড়দা আর বাবা একসঙ্গে কলকাতায় কলেজে পড়েছেন। নেত্রকোনা থেকেই বাবা শৈলজাদার সূত্রে শান্তিনিকেতনের মানুষজন, উৎসব, আনন্দ- এসবের কথা   জানতেন। শৈলজাদা যখন শান্তিনিকেতনে কাজে যোগ দেন নি তখন থেকেই তিনি রবীন্দ্রনাথের অন্ধ ভক্ত। ১৯৩১ সালে উনি দিনেন্দ্রনাথের কাছ থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখে সেইগুলি নিয়ে আসেন পদ্মার ওপারে নেত্রকোনায় আর রবীন্দ্রজন্মোৎসব করেন নেত্রকোনার দত্ত হাই স্কুলে।   পশ্চিমবাংলার গ্রামে তখনো  রবীন্দ্রজন্মোৎসব হ’ত না, হ’লেও সেটাকে বলা হ’ত রবীন্দ্রজয়ন্তী। যেহেতু আমার বাবাও গান বাজনা খুব  ভালোবাসতেন , এস্রাজ বাজাতে জানতেন, বড়দা গিয়ে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে মহড়া শুরু ক’রে দিতেন। এমন ও হয়েছে যে বড়দা গানএর স্বরলিপি  আগেই পাঠিয়ে দিয়ে বলতেন, মামা তুমি মহড়া আরম্ভ করে দাও।  সেইখানে আমার যখন ছ’ সাত বছর বয়েস তখন আমি একটা গান শিখেছিলাম – ‘স্বপন পারের ডাক শুনেছি জেগে তাই তো ভাবি’। মানে তো বুঝতাম না তখন, কিন্তু সুর টা মাথায় ঘুরত।  

আমার বাবাও ল’ পড়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিক্ষকতাই উপার্জনের রাস্তা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

১৯৫৩ সালে আমরা – মানে বাবা মা আর আমরা পাঁচ ভাই বোন বাংলাদেশ থেকে এসে আমাদের বড় মাসীর ব্যান্ডেলের বাড়ীতে উঠলাম। তখন সুখদা , মানে গিরিজারঞ্জন বাবাকে একবার শান্তিনিকেতনে ঘুরে যেতে বললেন। বাবা সেবার সাতদিনের জন্যে ঘুরতে এসে একটু বেশী দিন থেকে গিয়েছিলেন। ফেরার সময় সঙ্গে একটা সহজ পাঠ নিয়ে গেলেন। সহজপাঠের সেই গল্প – গেছোদাদা আর আরো সব , আমাদের মাতিয়ে ফেলল।  বাবা আর মা দেখলেন এখানে মেয়েরা যেরকম স্বাধীনভাবে বড়ো হয়সেরকম আর কোথাও হয়না। কাজেই ঠিক হ’ল শান্তিনিকেতনে আসা। এখানে এসে আমরা বড়দার নীচু বাংলার বাড়িতে উঠলাম। নীচু বাংলার বাড়িটা ছিল ক্যান্টিনের ঠিক পিছনে , যেখানে সমীর ঘোষ থাকতেন। বিশ্বভারতীর তখনকার কোয়ার্টার গুলো এখনকার মতো পলিশড ছিল না – টিনের বাড়ি খড়ের চাল – সেইখানেই আমরা খুব সুখে থাকতাম। বড়দা প্রথমে শান্তিনিকেতনে এসে এখানে সেখানে ঘুরে ঘুরে থাকতেন , কিন্তু যখন গিরিজারঞ্জনের স্ত্রী মারা গেলেন তখন ছোট দুই ভাইপো আর ভাইঝি বুদ্ধ আর গীতাকে নিয়ে নীচুবাংলোয় এলেন। ততদিনে তাঁর বোন আর ভগ্নিপতি মারা গেছেন,  তাঁদের বড়োছেলে সুনুও তাঁর কাছে আশ্রয় পেল। তার মধ্যে আমরাও এসে পড়লাম। আমার বাবা কোনো চাকরী না নিয়েই এখানে এসেছিলেন, আর প্রাইভেট টিউশনি করে উপার্জন করতেন। ধীরে ধীরে শিক্ষক হিসেবে সুনাম অর্জনের ফলে পাঠভবনে শিক্ষকের চাকরী পেয়ে গেলেন। তখন থেকে আমরা অন্য বাড়িতে উঠে গেলাম। বড়দা চলে গেলেন পূর্বপল্লীর বাড়িতে। বড়দা তখন সঙ্গীতভবনের দুপুরের ক্লাসের পরই আমাদের গুরুপল্লীর বাড়িতে চলে আসতেন খেলার মাঠ ক্রস করে শর্টকাট দিয়ে।

বড়দার বিয়েটা তাঁর মায়ের ইচ্ছেয় হয়েছিল। তাঁর মা সারদা সুন্দরীর আসামের ( তখন সিলেটের)  মন্ত্রীর মেয়ে অমিয়াকে দেখে খুব পছন্দ – তিনি ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন যে এই মেয়ের সঙ্গে শৈলর বিয়ে হলে খুব ভালো হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সেই ইচ্ছে পূরণ করেছিলেন আমার দুই পিসী। কিন্তু এই বিবাহ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। শৈলজাদা সব সময় রিহার্সাল নিয়ে ব্যস্ত, স্ত্রীকে নিয়ে বেড়ানো র দিকে মন নেই। এ থেকে বৌদির মনে ক্ষোভ জন্মে থাকতে পারে। একদিন বড়দা বাড়ি ফিরে দেখলেন বৈদি নেই। না বলেই চলে গিয়েছিলেন। একটা চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিলেন। শৈলজাদাও কিন্তু এত অভিমানী ছিলেন, তিনি আর বললেন না ‘ফিরে এসো’। তবে বড়দা খুব খেয়াল রাখতেন, ভাইদের বলতেন ‘তোর বৌদির খবর নিস’। বৌদি কলকাতার একটা স্কুলের হেডমিস্ট্রেস ছিলেন। তাঁরা দু’জনে আর একজায়গায় হলেন না কোনোদিন।

বড়দাকে যখন রথীবাবু ১৯৩৯ এ বললেন তখন রবীন্দ্রনাথ বেঁচে। বড়দা কিন্তু একটু ভয় পেয়ে গেলেন , বললেন , না না আমি এইসব দায়িত্ব নিতে আমি পারব না। রথীবাবু insist করলেন, না না , বাবামশায় বলেছেন, আর সময় নেই , আপনাকে এই দায়িত্ব টা নিতেই হবে। পরে আমাকে ঐ বাড়ির বারান্দায় বসে বললেন , ‘ তোমরা তো এই মাটির ছেলে , এখানেই বড়ো হয়েছ, তোমাদের এ সব দায়িত্ব নিত। কিন্তু আমি তো পরদেশী, এখানে বহিরাগত’। এই  যে ‘বহিরাগত’ – এই কথাটি ওঁর মনে সবসময় কাজ করত। যখন বড়দাকে সুধীরঞ্জন দাশ বললেন, ‘আপনি  তো অনেকদিন ধরে এই পদে আছেন, এবার এ কাজটা ছেড়ে দিন, অন্য কেউ করুক’ , তখন বড়দার মনে খুব লেগেছিল। বড়দা অফিস থেকে বেরিয়ে এসেই resignation দিলেন। আমাদের বাড়িতে এসে বাবার সঙ্গে কথা বললেন। আর মাত্র কয়েকটা মাস ছিল retire করার, তার ওপর রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষ আসছে – এমন সময় ঘটনাটা ঘটল। সেই সময় শান্তিদা এখানে ছিলেন না, মোহরদি ছিলেন। সুশীল ভঞ্জ অধ্যক্ষ হয়েছিলেন ওঁর পর। বড়দা বাবাকে বলেছিলেন, ‘সুধীরঞ্জন দাস যতদিন বিশ্বভারতীর উপাচার্য হয়ে থাকবেন , ততদিন আমি শান্তিনিকেতনে ঢুকবনা’। একে তো নিজেকে বহিরাগত ভাবতেন কারণ অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে সঙ্গীতভবন কে দাঁড় করাতে গিয়ে, তায় আবার অভিমানীও ছিলেন। এই আমরাই তো দেখি , আমরা যারা শান্তিনিকেতনে বাস করি, বাইরের কেউ কিছু বললেই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলি ‘আরে ও কী জানবে, ও আর কতদিন থেকেছে এখানে’।

কত কথাই যে বড়দা আমাকে বলেছেন। একবার এক অনুষ্ঠানের শেষে আমাকে বললেন, ‘জানো, গুরুদেব আমাকে একদিন বললেন, শৈলজা, তুমি কি আবার বিয়ে করবে? আমি বললাম, না গুরুদেব আমি আর বিয়ে থা’র ব্যপারে নেই’। গুরুদেব বললেন, ‘সেই ভালো। আমাকে দ্যাখো …’ দু’জনের অবস্থাটা কিন্তু একই রকম – একাকিত্ব। বড়দা তো শান্তিনিকেতনে অনেক বছর ছিলেন, সবরকম সমস্যা , অভিমানের কথা আমাদের সঙ্গেই হ’ত। 

বড়দা লোকজন খুব ভালোবাসতেন। আমাদের ভাই বোনেদের মধ্যে ইন্দ্রাণীর বিয়ে সবচেয়ে আগে হয়েছে,  তখন আমরা গুরুপল্লীতে। দেখি, একটা ছোট বাক্স নিয়ে বিয়ের তিন চারদিন  আগেই চলে এসেছেন। তখন বাড়ি ছোট, বড়দাকে কোথায় থাকতে দেব ভাবছি…ওর মধ্যেই কিন্তু সুন্দর adjust করে নিলেন। ওঁর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করতে হবে – এমন কোনো দাবীই ছিল না ।

বড়দা পরবর্তীকালে আমাদের বাড়িতে ভাইফোঁটা নিতে আসতেন। তবে আমাদের সঙ্গে কখনো বাঙ্গাল ভাষায় কথা বলতেন না বরং মাঝে মাঝে বীরভূমি ভাষায় বলতেন কাউকে নকল করে। ‘শান্তিনিকেতন যেইও না – শান্তিনিকেতনে  মেইয়েগুলো ছেইল্লেগুলো কে ধরছে তো ছাইড়ছে না । ঐ যে তনয়বাবুর বেটিটা নন্দবাবুর ছেলেকে ধইল্ল আর ছেইল্ল না। বিয়ে করে ছেইল্ল’। আমরা যে কত কাছ থেকে বড়দাকে পেয়েছি কি বলব। খুব হাসাতেন ।  

বড়দা আমার বাবাকে একটা এস্রাজ দিয়েছিলেন। সেটা বাবাও বাজাতেন আর আমরাও তাতে হাত পাকাতাম।  বড়দা এখান থেকে চলে যাবার পর একদিন বরকু ( বড়দার পিসতুতো ভাই) এসে বলল এই এস্রাজটা ও নিয়ে যাবে নৈহাটিতে যেখানে ওদের একটা গানের স্কুল আছে। বরকুর স্ত্রী সর্বাণী ও এস্রাজ বাজিয়ে গান গাইত । শৈলজাদা ওদের এই এস্রাজটা নিয়ে গিয়ে ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন। সে এস্রাজ এখনও সর্বাণী যত্ন করে রেখেছে।

পূর্বপল্লীর বাড়িতে বড়দার আরেকটা এস্রাজ রাখা ছিল অনেকদিন। বড়দা শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাবার পরেও সেটা এখানেই ছিল, গীতাদি ( গিরিজারঞ্জনের মেয়ে) সেটি দেখাশোনা করত। গীতাদি একদিন বললেন, ‘বাচ্চু, তোমার ছেলে যখন এত এস্রাজ বাজায় তখন জ্যাঠামনির এস্রাজটা তোমার ছেলেকেই তাহলে নিয়ে যেতে বলো। আমি বললাম ‘বেশ তো , তাহলে একটা অনুষ্ঠান করে এস্রাজটা নেওয়াই ভালো’ । আমাদের অবনপল্লীর বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান হল, খাওয়া দাওয়া হ’ল। আমার মা শুভায়ুকে একটা  বড়ো এস্রাজ দিলেন আর গীতাদি বড়দার এস্রাজটা দিলেন। বড়দার এস্রাজটা ছিল ছোটো, আগের কালের এস্রাজের মতো। সেই এস্রাজটা আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। বড়দার অনেক কিছু আমি যত্ন করে রেখেছি , যেখানে গেছেন যা পেয়েছেন। সম্বর্ধনার বই – কঙ্করদা আমাকে বললেন সুব্রত, এই যে অগ্নিরক্ষাটা বেরিয়েছিল শান্তিনিকেতন আশ্রমিক সঙ্ঘ শৈলজাদার শতবর্ষে বের করেছিল – সে বইটা rare – এখন আর পাওয়া যায়না। আমি বইটা সযত্নে রেখে দিয়েছি।

Share: